নাগরিক প্লাটফর্মের মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বক্তারা

৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দিতে বছরে ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি টাকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দলটি দেশের পাঁচ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেবে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। নাগরিক প্লাটফর্ম আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ৫০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড সহায়তার আওতায় আনতে বছরে আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ কোটি থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির দশমিক ১৫ থেকে দশমিক ২০ শতাংশ।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল ‘নতুন সরকারের সূচনাবিন্দু: অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এসব তথ্য-উপাত্ত দেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। এ সময় অর্থনীতিতে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করে তা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন পরামর্শ দেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানও সাংবাদিকদের উদ্দেশে অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

মূল প্রবন্ধে তৌফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থান থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়নে পৌঁছতে হলে ডলার ভিত্তিতে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের জন্য ৮ দশমিক ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জন করা কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে ধীরে চলো নীতি অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। দেশের আর্থিক সক্ষমতার বড় চ্যালেঞ্জকে বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ ও রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনী ইশতাহার বাস্তবায়ন হবে।’

এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ হিসেবে বলছেন, ‘ভোটের আগে কার্ড দিলে একদিকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্যদিকে প্রকৃত তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। এজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী দিনে অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে সেটা বোঝার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছে, সেগুলো মূল্যায়ন করার সুযোগ আমাদের ধীরে ধীরে হচ্ছে।’

নতুন সরকারকে একটি উত্তরণকালীন দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ দলের প্রাথমিক কাজ হবে বিগত আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ময়নাতদন্ত করে একটি দলিল বা ব্রিফিং ডকুমেন্ট তৈরি করা। সেটার ভিত্তিতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘বলা হচ্ছে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগোবে। তবে আমি সরকারের যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর বিপক্ষে, আমি ধৈর্য ধরতে বলব। চলতি অর্থবছরে নতুন কিছু না করে বরং পরবর্তী অর্থবছরের জন্য যথাযথভাবে পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংযম দেখালে আগামী অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি থেকে শুরু করে অন্য অসুবিধাগুলো পরিষ্কারভাবে উতরে যাবে।’

অনুষ্ঠানে নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যেসব ক্রয় চুক্তি করে গেছে, সেখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কিনা, তা পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন। বিগত সরকার বিভিন্ন ধরনের বৈদেশিক চুক্তিও করেছে। এসব চুক্তি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি বা শুধু বন্দর দিয়ে দেয়ার জন্য হয়নি। অন্যান্য ক্ষেত্রেও হয়েছে, যেগুলো সম্পর্কে হয়তো আমরা এখনো অবহিত নই।’ এসব বৈদেশিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রবাসী আয়ের ওপর দেয়া প্রণোদনা কমানোর পরামর্শ দিয়ে সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রেমিট্যান্সের ওপর প্রণোদনা, রাজস্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ অর্থনৈতিক চাপটা অবশ্যই হিসাব করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রণোদনা কমানোর পাশাপাশি টাকার মূল্য বাজারভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রবাসীরা তখন প্রতি ডলারের বিপরীতে দেশে বেশি টাকা পাবেন। ফলে টাকা কিছুটা অবমূল্যায়িত হলে রেমিট্যান্সের প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।’

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘ইশতাহারগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকে এগোনো উচিত। প্রথমেই সবগুলোর ব্যাপারে না যাওয়া। কারণ আর্থিক সক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জ হবে এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।’ মূল প্রবন্ধে তিনি নতুন সরকারের ১০টি চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।

সরকারের ব্যয় হ্রাস নিয়ে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ প্রণোদনার ব্যয় আছে রফতানি ও রেমিট্যান্সে। এটা ধীরে ধীরে তুলে নেয়ার এখন সুযোগ আছে। এ অর্থবছর থেকে শুরু করে আগামী অর্থবছরে এটা তুলে দেয়া প্রয়োজন। সরকারের ব্যয়ের চাপ আছে, সেটা থেকে বের হয়ে আসা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরো বেশি রক্ষণশীল পন্থা নেয়া দরকার। নতুন প্রকল্পে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ ও বিদেশী অর্থায়নের প্রকল্পে মনোযোগী হওয়া দরকার। করহার বাড়াতে পদক্ষেপ, সরকারের লাভবান প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করা ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে মনোযোগী হতে হবে। এ সরকারের প্রথম পরীক্ষা হবে তারা কতখানি বাস্তবসম্মতভাবে বাজেট সংশোধন করতে পারেন।’

তৌফিকুল ইসলাম খান আরো বলেন, ‘সরকারের প্রথম কাজ হবে ২০২৪ সালের বাজেট সংশোধন করা। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামো প্রস্তুত করা। এরপর ধীরে ধীরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দিকে এগোনো। তবে তা অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে করা উচিত।’

আরও